দেশে গণতন্ত্রবিরোধীরা আবার জোট পাকাচ্ছ: মির্জা ফখরুল
শনিবার দুপুরে গণতন্ত্র মঞ্চের এক আলোচনা সভায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপির মহাসচিব এই মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘‘ ভয়াবহ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে… আমরা একটা সুযোগ পেয়েছি নতুন করে বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করবার।দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা দেখি যত দিন যাচ্ছে পরিস্থিতি যেন জটিল হয়ে উঠছে।”
‘‘ আমরা কাছে যেটা মনে হয়, যত দিন যাচ্ছে ততই যারা গণতন্ত্র বিশ্বাস করে না, যারা জনগণের অগ্রযাত্রা বিশ্বাস করে না, যারা একটা শোষনহীন সমাজ গড়ে উঠার যে রাজনীতি সেই রাজনীতি বিশ্বাস করে না তারা আবার জোট পাকাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে যে ফ্যাসিস্ট যাকে আমরা বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছিলাম তারা ভেতরে ভেতরে আবার সংগঠিত হচ্ছে এবং ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে।”
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘ আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাতে চাই যে, আপনরা দয়া করে বহুবার বলেছি, আবারও বলছি কাল বিলম্ব না করে যত দেরি করছে ততই কিন্তু পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হচ্ছে এবং সেই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে যারা ছিলো, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যারা রয়েছে, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যারা রয়েছে তারা আবার সংগঠিত হয়ে সেই গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করবার জন্য কাজ শুরু করেছে।”
‘‘ তাই দেরি না করে যত দ্রুত সংস্কার, সনদ এবং নির্বাচন এই তিনটি বিষয়কে সামনে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারা যায় ততই দেশের জন্য মঙ্গল হবে। দায়িত্বটা নিসন্দেহে এই অন্তবর্তীকালীন সরকারের। আমরা খুব আশাবাদী যে, আমাদের অন্তবর্তীকালীন সরকারের যিনি নেতা তিনি হচ্ছেন এদেশের একজন বরণ্যে ব্যক্তিত্ব, তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি একজন ব্যক্তি যিনি তার বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা, সততা এবং দেশপ্রেম দিয়ে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে আমাদেরকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন।’
জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে ‘গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এই আলোচনা সভা হয়।
‘এবার সুযোগ হারালে দেশে পিছিয়ে পড়বে বহুবছর’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ আমরা হঠা হঠা লক্ষ্য করে দেখছি যে, মবোক্রেসি, হত্যা, ছিনতাই, গুম ভয়ানকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এই বিষয়গুলো বিশেষ করে সচেতন নাগরিক এবং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমাদেরকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলছে।’
‘আমি পার্টিকুলারলি কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির প্রতি কোনো কথা বলতে চাই না এবং বলিও না। আমি সংক্ষেপে যে কথাটা বলতে চাই যে, সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে এই সুযোগকে যদি আমরা হারিয়ে ফেলি তাহলে বাংলাদেশ আরও বহু বছর পিছিয়ে যাবে। প্রতিবার একটা করে অভ্যুত্থান হবে, জনগণ প্রাণ দেবে, আমাদের ছেলেরা প্রাণ দেবে এবং সুযোগ তৈরি হবে। আর আমরা আমাদের দায়িত্বহীনতার কারণে আমরা সেই সুযোগ হারাবো এটা হতে দেয়া উচিত নয়।’
ফ্যাসিস্ট আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করেছি যে, আমরা দেশকে ভালোবাসি। আমাদের শক্তি ক্ষুদ্র হোক, বৃহৎ হোক আমাদের যতটুকু শক্তি আছে সেই শক্তি দিয়ে আমরা এদেশকে কিন্তু ফ্যাসিবাদ মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করেছি। কেউ রক্তাক্ত হয়েছে, কেউ প্রাণ দিয়েছে, কেউ কারাগারে গেছে এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, আমাদের তারেক রহমান সাহেব নির্বাসিত অবস্থায় আছেন।’
‘আজকে যে দায়িত্বশীলতা আমরা বিরোধী দলগুলো দেখিয়েছি, আমরা আশা করব যে, সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে যারা দায়িত্বে রয়েছেন একটি সকল দলের কাছে গ্রহনযোগ্য একটা ব্যবস্থা যেটা জনগণের বন্দোবস্ত সেই বন্দোবস্তের একটা রুপরেখা আমাদের সামনে তুলে ধরবে এবং সেই রুপরেখা নিয়ে একমত হয়ে আমরা জনগণের কাছে যাবো,নির্বাচন হবে সেই নির্বাচনে আমাদের বিএনপির যে কমিটমেন্ট আমরা আবার সবাই মিলে দেশকে নির্মাণ করবার জন্য যে বিষয়গুলো কমিট করেছি সেই ৩১ দফা, তার বাস্তবায়ন করব।’
‘অতীতের মতো এবারও আমরা পারব’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ আমি নেতিবাচক কথা বলতে চাই না। আমি শুধু এইটুকু বলতে চাই যে, আমরা অনেকের কাছে অনেকভাবে একটা নেতিবাচক, হতাশাব্যঞ্জক কথা শুনতে পাচ্ছি। আমরা মনে করি, আমরা অতীতে যেমন পেরেছি, এবারও আমরা পাবর। অতীতে যেমন সমস্ত প্রতিবন্ধতাকে উপেক্ষা করে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি, জেল-জুলুম-গুলি কোনো কিছুই আমাদের ঠেকাতে পারেনি, আগামী দিনগুলোতে কোনো বাধাই ঠেকাতে পারবে না।’
‘আসুন আমরা সবাই একটা বিষয় একমত হই যে, আমাদের এই দেশকে এই রাষ্ট্রকে আবার ফ্যাসিবাদের হাতে ছেড়ে দেবো না। আমাদের মানুষের মানুষের যে আকাংখা সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য আমরা সবাই একমত হতে পারব ইনশাল্লাহ।হয়ত বিভিন্ন জায়গায় মতভেদ থাকতে পারে সেইগুলোর ব্যবস্থা আবার চলে যাব জনগণের কাছে সেইগুলোর সুরাহা হবে।’
‘একাত্তর প্রশ্নে কোনো আপোষ নেই’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘একটা কথা আমি মনে করি দিচ্ছি, ১৯৭১ হচ্ছে আমাদের মূল কথা, স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের মূল কথা। এখানে আমাদের কোনো কমপ্রোমাইজ নাই।’
‘আমাদের কোনো কমপ্রোমাইজ নাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, আমরা অবশ্যই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, এবং গণতন্ত্র আমরা চাই। বাকি সব কিছু আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করব আমরা। গণতন্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে, আলোচনা, সহনশীল, অন্যের মতকে মেনে নেওয়া সব কিছু নিয়ে আমরা অবশ্যই এমন একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারব যেখানে থেকে আমরা আবার নতুন করে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘সংস্কার তো আমরাই দিয়েছি। আলোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হতে পারে।’
‘সরকারকে আহ্বান করব, অযথা বিলম্ব সৃষ্টি না করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কথা বলুন। কথা বলে সেই সমস্যা শেষ করে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যান সেটাই বোধহয় একমাত্র পথ।’
‘দক্ষিণপন্থির উত্থান দেখা যাচ্ছে’
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘ একবছরের পেছনের যদি একটু তাঁকান, এক বছরে গোটা রাজনীতির একটা গুনগত একটা পরিবর্তন হয়েছে।আমাদের চিন্তার দিক থেকে মতাদর্শের দিক থেকে রাজনীতির দিক থেকে একটা দক্ষিনপন্থি চিন্তার, দক্ষিন পন্থি ভাবাদর্শের তার একটা উত্থান এখানে সংগঠিত হয়েছে।’
‘আমরা দেখছি, এই অন্তবর্তী সরকার তাদের কোলে নিয়ে বুকে নিয়ে তারা এই জায়গাটা তৈরি করছেন। অনেকে গাছেরটাও খাচ্ছেন আবার নিচেরটাও কুড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশটা যাচ্ছে কোথায়? গোটা লড়াইটা ছিলো বৈষ্যমের বিরুদ্ধে। বৈষ্যম মানে কি? কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিককে তার রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্ম বিশ্বাসের জন্য, সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের জন্য,নাগরিকের গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য করবে না। বাংলাদেশ কি সেই পথে হাটতে পারছে? খুবই দুর্ভাগ্যজনক আমরা অনেক আলোচনা করছি কিন্তু সরকার এখনও আমরা দেখছি.’ আমরা কিন্তু ঠিকমত সেই পথে এগুতে পারছি না।
‘পরিস্কারভাবে ষড়যন্ত্র চলছে’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘নানান লক্ষণ আমরা দেখছি। মিটফোর্ডে যেভাবে একটা হত্যা করা হয়েছে এবং যেভাবে তার ভিডিও ফুটেজ, ন্যারেটিভ হাজির হয়েছে পরিস্কারভাবে ষড়যন্ত্র চলছে। যেভাবে গোপালগঞ্জে হামলা হয়েছে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখানোর জন্য ষড়যন্ত্র চলছে।’
‘মনে রাখা দরকার আজকে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন এই তিনটা জিনিসই আমাদের রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য অপরিহার্য্ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমরা বিচার চাই, সংস্কার চাই, আমরা সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন চাই। নির্বাচন ছাড়া সংস্কার সম্পন্ন হবে না, জনগণের অংশগ্রহন ছাড়া সংস্কার সম্পন্ন হবে না। কাজেই কোনোভাবে নির্বাচনকে ব্যাহত করা চেষ্টা আসলে বিচার এবং সংস্কারকেও ব্যাহত করা চেষ্টা।’
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ শহিদুল ইসলাম বাবলুর সভাপতিত্বে ও মহাসচিব আবু ইউসুফ সেলিম সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ুম, জেএসডি’র তানিয়া রব, এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার, গণফোরামের এম মিজানুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর,জাতীয় নাগরিক পার্টির আখতার হোসেন, গণসংহতি আন্দোলনের আবুল হাসান রুবেল, বাংলাদেশ জাসদের নাজমুল হক প্রধান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নঈম জাহাঙ্গীর প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।
